মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলার ঐতিহ্য

ইতিহাস সীতাকুন্ড বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা। এলাকাটি পাহাড়ি এবং পহডচূড়াগুলি অজস্র হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মস্থান মন্দির ইত্যাদিতে পূর্ণ। এই উপজেলার প্রধান শহর সীতাকুণ্ড, যা চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটি আয়তনের দিক থেকে চট্টগ্রামের ২৬ টি উপজেলার ভিতর তৃতীয় এবং জনসংখ্যার দিক থেকে ষষ্ঠ।

       প্রাচীন নব্যপ্রস্তর যুগে সীতাকুণ্ডে মানুষের বসবাস শুরু হয় বলে ধারনা করা হয়। এখান থেকে আবিষ্কৃত প্রস্তর যুগের আসামিয় জনগোষ্ঠীর হাতিয়ার গুলো তারই স্বাক্ষর বহন করে। ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায়, ৬ষ্ঠ ও ৭ম শতাব্দীতে সম্পূর্ণ চট্টগ্রাম অঞ্চল আরাকান রাজ্যের অধীনে ছিল। এর পরের শতাব্দীতে এই অঞ্চলের শাসনভার চলে যায় পাল সম্রাট ধর্মপাল দ্বারা এর হাতে (৭৭০-৮১০ খ্রীঃ)। সোনারগাঁও এর সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ্ (১৩৩৮-১৩৪৯ খ্রীঃ)১৩৪০ খ্রীষ্টাব্দে এ অঞ্চল অধিগ্রহন করেন। পরবর্তীতে ১৫৩৮ খ্রীষ্টাব্দে সুর বংশের শের শাহ্ সুরির নিকট বাংলার সুলতানি বংশের শেষ সুলতান সুলতান গীয়াস উদ্দীন মুহাম্মদ শাহ্ পরাজিত হলে হলে এই এলাকা আরাকান রাজ্যের হাতে চলে যায় এবং আরাকানীদের বংশধররা এই অঞ্চল শাসন করতে থাকেন। পরবর্তীতে পর্তুগীজরাও আরাকানীদের শাসনকাজে ভাগ বসায় এবং ১৫৩৮ খ্রী: থেকে ১৬৬৬ খ্রী: পর্যন্ত এই অঞ্চল পর্তুগীজ ও আরাকানী বংশধররা একসাথে শাসন করে। প্রায় ১২৮ বছরের রাজত্ব শেষে ১৯৬৬ খ্রী: মুঘল সেনাপতি বুজরুগ উন্মে খান আরাকানীদের এবং পর্তুগীজদের হটিয়ে এই অঞ্চল দখল করে নেন। পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দেৌলার পরাজয়ের পর এই এলাকাটিও ইংরেজদের দখলে চলে যায়। পরবর্তীতে ১৯০৮ সালে স্বদেশী আন্দোলনের সময় এই অঞ্চলের কর্তৃত্ব স্বদেশীদের হাতে আসে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই এলাকাটি ২ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ভাষা ও সংষ্কৃতি সীতাকুন্ড উপজেলার ভূ-প্রকৃতি ও ভৌগলিক অবস্থান এই উপজেলার মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি গঠনে ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত এই উপজেলাকে ঘিরে রয়েছে পাহাড় আর সমুদ্র।এখানে ভাষার মূল বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের অন্যান্য উপজেলার মতই, তবুও কিছুটা বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া যায়।চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা এ অঞ্চলের অনন্য বৈশিষ্ট্য।বিশেষতঃ সন্দীপ ,সীতাকুন্ড,চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের সংমিশ্রনে সীতাকুন্ডের ভূ-প্রকৃতি নির্ধারিত হয়েছে। ভূতত্ত্ববিদদের মতানুসারে ফেনী নদী থেকে আরম্ভ করে চন্দ্রনাথ পাহাড় তথা সীতাকুন্ড পাহাড় শ্রেনীর পশ্চিমাঞ্চল, দক্ষিনে কর্ণফলী পর্যন্ত এলাকাটি প্রাচীন কালে সমুদ্রের জলরাশির তলায় নিমজ্জিত ছিল । পরবর্তীতে ফেনী নদীর স্রোতধারা এবং সীতাকন্ড পার্বত্য অঞ্চল থেকে প্রবাহিত বিভিন্ন ছরা স্রোতধারার মাধ্যমে বাহিত পলি মাটি দ্বারা এই অঞ্চল গঠিত হয় । প্রথম দিকে এই এলাকাটি জঙ্গলাকীর্ণ ছিল, বাসপোয়োগী ছিল না । প্রকৃতির ক্রমবিবর্তনে এই পাহাড়ী অঞ্চলটি পশ্চিমদিকে সম্প্রসারিত হয় এবং কালক্রমে বাসপোয়োগী হয়ে উঠে। প্রথম দিকে অঞ্চলটিতে আদি অধিবাসীরাই বসবাস করত । সেই আদি অধিবাসিদের বংশধরেরা আজও সীতাকুন্ড পার্বত্য অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করছে । আরও পরে ত্রিপুরা ,নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড পাহাড়ের পূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত অঞ্চল হতে আগত জনগোষ্ঠী জঙ্গলকেটে এই অঞ্চলকে বাসপযোগী করে তোলে । এই অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে পার্বত্য ত্রিপুরা মহারাজ এবং আরাকান রাজার সাথে অনেক বার দ্বন্দ্ব হয়েছে। কখনও আরাকান রাজারা এই অঞ্চল শাসন করেছে । আবার কখনও পার্বত্য ত্রিপুরার আগরতলা মহারাজা এ অঞ্চল শাসন করেছে। আরাকান রাজাদের শাসনামলে এখানে মগেরা বসতি বিস্তার করে । আগরতলা মহারাজার শাসনামলে ত্রিপুরার জনগোষ্ঠিও এখানে বসবাস করে। অপর পক্ষে পর্তুগীজ জলদস্যুরা সমুদ্র পথে চট্টগ্রাম এসে চট্টগ্রামকে পোর্টো গ্রান্ডো নাম করন করে সন্ধীপ দ্বীপকে কেন্দ্র করে তারা এতদ অঞ্চলে বসবাসও করেছে। সমসায়িক সময়ে আরবেরাও সমুদ্র পথে এ অঞ্চলে আগমন করেছে। এবং কেউ কেউ স্থানীয় ভাবে বসতি স্থাপনও করেছিল। যারা নোয়াখালী জেলার দাদরা থেকে এখানে এসে বসবাস করেছিল তারা দারাইল্যা হিসেবে পরিচিত যারা তারাসরাইল থেকে এদিকে এসে বসতি স্থাপন করেছিল তারা সরাইল হিসেবে পরিচিত । যারা সন্ধীপ থেকে এদিকে এসে বসতি স্থাপন করেছিল তারা সন্ধীপী হিসেবে পরিচিত। উত্তর ও মধ্য চট্টগ্রাম থেকে যারা এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছিল তারা চট্টগ্রামী হিসেবে পরিচিত। বলতে গেলে বিভিন্ন শোনিত ধারার মিশ্রণে এতদাঞ্চলে একটি শংকর জনগোষ্ঠি গড়ে ওঠে এবং তার প্রমান পাওয়া যায় এ অঞ্চলের অধিবাসীদের ভাষা,সংস্কৃতি চালচলন ইত্যাদিতে। যাতে নোয়াখালী,কুমিলস্নার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়-যা একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক।

        

    সীতাকুন্ড চন্দ্রনাথ পাহাড় বাংলাদেশে বসবাসকারী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড। শুধু তাই-ই নয় এই স্থানটি বর্তমানে পর্যটক আকর্ষণেও অনেকটা এগিয়ে। বিশেষত সীতাকুন্ডের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য যেকোনো ভ্রমণকারীকে আপন করে নিতে সক্ষম। সীতাকুন্ডের সবচাইতে দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্র হলো “চন্দ্রনাথ পাহাড়”। সীতাকুন্ড বাজার থেকে পূর্ব দিকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে এই পাহাড়টি অবস্থিত। জনশ্রুতি রয়েছে যে, নেপালের এক রাজা ঘুমের মধ্যে পৃথিবীর পাঁচ স্থানে শিব মন্দির স্থাপনের আদেশ পান। স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে নেপালের সেই রাজা পৃথিবীর পাঁচ স্থানে পাঁচটি শিব মন্দির স্থাপন করেন। এগুলো হলো – নেপালের পশুপতিনাথ, কাশিতে বিশ্বনাথ, পাকিস্তানে ভুতনাথ, মহেশখালীর আদিনাথ এবং সীতাকুন্ডের চন্দ্রনাথ মন্দির। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ ও ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায় প্রাচীন আমলে এখানে মহামুনি ভার্গব বাস করতেন। অযোধ্যার রাজা দশরথের পুত্র রামচন্দ্র তার বনবাসের সময় এই স্থানে এসেছিলেন। মহামুণি ভার্গব রাজা দশরথের পুত্র রামচন্দ্র আগমন করবেন জেনে তাদের গোসল করার জন্য এখানে তিনটি কুন্ড সৃষ্টি করেন। রামচন্দ্রের সাথে তার স্ত্রী সীতাও এখানে এসেছিলেন। রামচন্দ্রের স্ত্রী সীতা এই কুন্ডে গোসল করেছিলেন এবং সেই থেকে এই স্থানের নাম সীতাকুন্ড। প্রাচীন নব্যপ্রস্তর যুগে সীতাকুণ্ডে মানুষের বসবাস শুরু হয় বলে ধারনা করা হয়। এখান থেকে আবিষ্কৃত প্রস্তর যুগের আসামিয় জনগোষ্ঠীর হাতিয়ার গুলো তারই স্বাক্ষর বহন করে। ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায়, ৬ষ্ঠ ও ৭ম শতাব্দীতে সম্পূর্ণ চট্টগ্রাম অঞ্চল আরাকান রাজ্যের অধীনে ছিল। এর পরের শতাব্দীতে এই অঞ্চলের শাসনভার চলে যায় পাল সম্রাট ধর্মপাল দ্বারা এর হাতে (৭৭০-৮১০ খ্রীঃ)। সোনারগাঁও এর সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ্ (১৩৩৮-১৩৪৯ খ্রীঃ)১৩৪০ খ্রীষ্টাব্দে এ অঞ্চল অধিগ্রহন করেন। পরবর্তীতে ১৫৩৮ খ্রীষ্টাব্দে সুর বংশের শের শাহ্ সুরির নিকট বাংলার সুলতানি বংশের শেষ সুলতান সুলতান গীয়াস উদ্দীন মুহাম্মদ শাহ্ পরাজিত হলে হলে এই এলাকা আরাকান রাজ্যের হাতে চলে যায় এবং আরাকানীদের বংশধররা এই অঞ্চল শাসন করতে থাকেন। পরবর্তীতে পর্তুগীজরাও আরাকানীদের শাসনকাজে ভাগ বসায় এবং ১৫৩৮ খ্রী: থেকে ১৬৬৬ খ্রী: পর্যন্ত এই অঞ্চল পর্তুগীজ ও আরাকানী বংশধররা একসাথে শাসন করে। প্রায় ১২৮ বছরের রাজত্ব শেষে ১৯৬৬ খ্রী: মুঘল সেনাপতি বুজরুগ উন্মে খান আরাকানীদের এবং পর্তুগীজদের হটিয়ে এই অঞ্চল দখল করে নেন। পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দেৌলার পরাজয়ের পর এই এলাকাটিও ইংরেজদের দখলে চলে যায়। পরবর্তীতে ১৯০৮ সালে স্বদেশী আন্দোলনের সময় এই অঞ্চলের কর্তৃত্ব স্বদেশীদের হাতে আসে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই এলাকাটি ২ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত ছিলো।

   

ছবি